প্রতারণা কার?

স্টাফ রিপোর্ট

মাত্রই বিয়ের বছর পূর্ণ হয়েছে। মধুচন্দ্রিমার আমেজ পেরিয়ে ধীরে ধীরে এখন সংসার গুছিয়ে নেওয়ার কথা। মৌসুমী-জাকেরের বেলায় তা হয়নি। এক বছরে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে তাদের ঘর-গেরস্থালি। একজন থাকেন আমেরিকায়, একজন বাংলাদেশে। দুজন-দুজনকে কাছাকাছি পেয়েছেন খুব অল্প সময়। এই অল্প সময়ে কেউই কারো কাছের হয়ে উঠতে পারেননি। স্ত্রীর বিরুদ্ধে জাকেরের অভিযোগ বিশ্বাসভঙ্গের, প্রতারণার। মৌসুমীর পক্ষ থেকে একই রকম অভিযোগ- জাকের তাকে ঠকিয়েছেন। দুজনের সম্পর্কের এমন পরিণতি গড়িয়েছে আদালতে।

মহামারী করোনা তখনও বাংলাদেশে ছোবল হানেনি। সিলেটের গোলাপগঞ্জ ভাদেশ্বর দক্ষিণভাগ গ্রামের আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে জাকের আহমদের সাথে ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি বিয়ে হয় জৈন্তাপুর থানার নিজপাট চুনাহাটি গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রফিকুর আর এম এ মুনিমের মেয়ে শারমিন সুরভী মৌসুমীর। মাত্র ১৩ দিন স্বামীর ঘরে কাটে মৌসুমীর। বিয়ের ১৩ দিন পর মৌসুমী তার বাবা-মায়ের সাথে আমেরিকা চলে যান। করোনাভাইরাস তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। মৌসুমীর আর আসা হয়নি বাংলাদেশে। আমেরিকা চলে গেলেও মোবাইল ফোন-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম্যের বদৌলতে যোগাযোগে ভাটা পড়েনি মৌসুমী-জাকেরের। তবে এরই মাঝে যে, দুজনের সংসারে ঘুণ বাসা বেঁধে নিয়েছে তা কিন্তু স্পষ্ট হয়নি।

সম্পর্কে অভিশ্বাস স্পষ্ট হতে থাকে ধীরে ধীরে। প্রথমে চিড় ধরে সম্পর্কে, সে চিড় রূপ নেয় ফাটলে। প্রতারণার অভিযোগে মৌসুমীর বিরুদ্ধে মামলা করেন জাকের আহমদ। তার অভিযোগ, আগের একটি বিয়ে থাকলেও নিজেকে ‘কুমারী’ দাবি করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন মৌসুমী। এমনকি তার ৫ বছর বয়সী ছেলের কথাও গোপন রেখেছিলেন। শুধু তাই নয় বিয়ের পর নানা অজুহাতে তার কাছ থেকে ২১ লাখ টাকার মালামাল হাতিয়ে নিয়েছেন।

জাকেরের বিরুদ্ধে মৌসুমীর অভিযোগও কম গুরুতর নয়। তার অভিযোগ, জাকের আহমদ শারীরিকভাবে অক্ষম। অনেক কিছু ভেবে প্রথম দিকে তিনি বিষয়টি মেনে নেন। কিন্তু এক পর্যায়ে উপলব্ধি করেন এভাবে সংসার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মৌসুমীরও অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে জাকের তার কাছ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা নিয়েছেন।

দুই পক্ষই নিজেদের অভিযোগে অটল। জাকেরের বড় ভাই জামিল আহমদ একাত্তরের কথাকে বললেন, মৌসুমীর সব অভিযোগ মিথ্যা। প্রথম বিয়ের বিষয়টি গোপন রেখে তারা আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। তবুও আমরা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকাও দাবি করতে থাকে।

মৌসুমীর বাবা রফিকুর আর এমএ মুনিম বললেন, জাকেরের পরিবার আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মৌসুমীর প্রথম বিয়ের কথা জেনেই তারা বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেয়। এমনকি মেয়ে দেখতে এসে তারা মৌসুমীর ছেলেকে ১ হাজার টাকা সালামিও দেয়। কিন্তু জাকেরে শারীরিক অক্ষমতার বিষয়টি জানতে পেরে আমরা আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইনি। এখন তারা উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। বিয়ের সময় বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজ উপস্থাপন না করতে পারায় কাজি বৈবাহিক অবস্থার ঘরটি শূন্য রাখেন। এ শূন্যস্থানটিতেই কৌশলে তারা ‘কুমারী’ শব্দ বসিয়ে জালিয়াতি করেছে। তিনি বলেন, জাকের যদি নাই জানতো মৌসুমীর প্রথম বিয়ের কথা তাহলে বিয়ের সময় ছেলেসহ মৌসুমীর সাথে ছবি তুললো কী করে? তখন তো প্রশন করেনি।

জাকেরের ভগ্নিপতি সুহেল আহমদ জাকেরের শারীরিক অক্ষমতার অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করেন। প্রমাণ হিসেবে একাত্তরের কথার কাছে চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাফিয়া রহমানের একটি ব্যবস্থাপত্র এবং প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্টও সরবরাহ করেন। সুহেল আহমদ বলেন, মৌসুমীর পরিবার সিন্ডিকেটের মতো বিয়ের নাটক সাজিয়ে মানুষদের সাথে প্রতারণা করছে।

তিনি বলেন মৌসুমীর পরিবার তার আগের স্বামীর কাছ থেকেও বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাত করেছে। তিনি বলেন, বলতে দ্বিধা নেই-আমরা কিছুটা লোভে পড়ে গিয়েছিলাম। ‘আমেরিকান কন্যা’ দেখে খুব একটা খোঁজ খবর নিইনি। তারা এ সুবিধাটাকেই কাজে লাগিয়েছে। জাকেরকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ২০ লাখ টাকা দাবি করলে আমরা তাদের প্রকৃত চেহারাটা চিনতে পারি।

জাকেরের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন, মৌসুমীর বাবা। তিনি বলেন, উল্টো এক বছরের বিভিন্ন সময়ে মৌসুমীই জাকেরকে প্রায় ৫ লাখ টাকার মতো দিয়েছে। প্রমাণ হিসেবে তিনি মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকা প্রদানের বেশ কিছু রশিদ একাত্তরের কথার কাছে সরবরাহ করেন।

এয়ারপোর্ট থানার ওসি মুহাম্মদ মাঈনুল জাকির একাত্তরের কথাকে বলেন, শারমিন সুরভী মৌসুমীর বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন জাকের আহমদ। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।