মুক্ত হাওয়ায় ৫০ বছর: এই ঋণ শুধিবার নয়

চৌধুরী মুমতাজ আহমদ ::

৩৬৫ দিন ধরে হিসেব করলে ৫০ বছরে ১৮ হাজার ২৫০ দিন। মাঝে ১২টি লিপ ইয়ারে ১টি করে বাড়তি আরও ১২টি দিন। সব মিলিয়ে ১৮ হাজার ২৬২ দিন। নীল আকাশের বুকে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে ১৮ হাজার ২৬২ দিন আগে বাঙালি পৃথিবীকে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়েছিলো। মুক্ত হাওয়ায় নিঃশ্বাস কিনে নেওয়ার মূল্য কিন্তু বাঙালিকে কম দিতে হয়নি। এই ১৮ হাজার ২৬২ দিনের মাঝে ১৬৬ দিনই গেছে মুক্তির লড়াইয়ে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য আগে থেকেই বাঙালিকে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। একাত্তরের ৭ মার্চ ঘোড়দৌড়ের মাঠেই (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দৌড়ে পালানোর রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেষ কাজটিও করে যান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু চোখের সামনে ছিলেন না। তবে চোখের সামনে ভাসছিলো তার উত্তোলিত তর্জনী। কানে ভাসছিলো তার বজ্রকণ্ঠ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাঙালি জীবনবাজি রেখে বঙ্গবন্ধুর সে ঘোষণাকে সত্য করেছিলো। ৩০ লাখ প্রাণ আর ২ লাখ মা-বোনের সর্বস্ব হারানোর বিনিময়ে বিজয় ধরা দেয় বাঙালির হাতের মুঠোয়।
আজ সে বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে এক সমীহজাগানিয়া জাতি। তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। পেছন থেকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সারা পৃথিবী। এই তো কদিন আগেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। স্বল্পোন্নত ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ তিনটি সূচকের যে কোন দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদণ্ডেই উন্নীত হয়েছে।
মাত্র ৫০ বছরে ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত’ বাংলাদেশ আজ ঈর্ষণীয় এক অবস্থানে পৌঁছেছে। পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশেও ছুটে গেছে বাংলাদেশের বিজয় রথ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে কেবলই উপরের দিকে উঠছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নানা প্রকল্প হাতে নিয়ে বাংলাদেশ নিজের দুঃসাহসী পরিচয়ও জানিয়ে দিয়েছে বিশ্ব।
আজকের এই বাংলাদেশের সকল কৃতিত্ব ৫০ বছর আগের ঘরছাড়া সেই দামাল ছেলেদের। হালের লাঙল ফেলে যারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলো এ সফলতা তাদেরই উপহার। যে মা, যে বোন চোখের জলে সব হারানোর ব্যথা সয়ে নিয়েছিলেন, যারা বুকের রক্ত দিয়ে সবুজ ঘাসে লাল আখরে লিখেছিলেন বাংলাদেশ- আজ আমরা তাদের কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছি।

একাত্তরের কথা/ এমইউএ