মানসিক সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী

মহামারী পরিস্থিতি

একাত্তর ডেস্ক :: নিজে কিংবা পরিবারের সদস্যরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েছেন বলে একটি জরিপে উঠে এসেছে। সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত ‘বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কোভিড-১৯ প্যানডেমিকের প্রভাব’ শীর্ষক জরিপে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংগঠনের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
আঁচল ফাউন্ডেশন জানায়, শিক্ষার্থী বা তার পরিবারের সদস্যরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রধান কারণ। জরিপে অংশগ্রহণকারী ২ হাজার ৫৫২ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মহামারীকালে জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ বা ২ হাজার ১৬০ জন মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়ার তথ্য দিয়েছেন। এদের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বেশি সংখ্যায় এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, যা জরিপে মোট অংশগ্রহণকারী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর ৮৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এদের কোভিডকালীন মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার দ্বিতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সঠিক সময়ে না ঘুমানোর কথা উঠে এসেছে জরিপে।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় দিনের বড় একটা সময় তাদের স্ক্রিনের সামনে অতিবাহিত করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকায় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া, মাথা ব্যথা, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটা অন্যতম। মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির আরেকটি বড় কারণ এটি বলে জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে সংগঠনটি।
এছাড়া জরিপ থেকে মানসিক সমস্যার আরও যেসব কারণ চিহ্নিত করা গিয়েছে সেগুলোর শীর্ষে রযেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, দ্বিতীয় স্থানে আছে একাকীত্ব। অপরদিকে সেশনজটকে মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে তৃতীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আঁচল ফাউন্ডেশন জানায়, ধারাবাহিক জরিপ কাজের অংশ হিসেবে পরিচালিত এবারের জরিপটির মূল লক্ষ্য ছিল কোভিড-১৯ মহামারির ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করা।
জরিপে প্রাপ্ত ফলাফল থেকে জানা যায়, মহামারীকালে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়ে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মন খারাপ থাকা, ঠিকমত ঘুম না হওয়া, নিজেকে তুচ্ছ ভাবা ইত্যাদির সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া ৯৯৯ জন পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ১ হাজার ৫৫২ জন নারী শিক্ষার্থীর ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।
কোভিডকালীন অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী মহামারীকালে শহরে অবস্থান করেছেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী মোট শিক্ষার্থীর ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী শহরে এবং ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ গ্রামে অবস্থান করেছেন। এদের মধ্যে যারা বিষন্নতায় ভুগেছেন তাদের মধ্যে শহরে ছিলেন ৮৪ শতাংশ ও গ্রামে ছিলেন ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ। এ হিসাবে শহরের চেয়ে গ্রামে অবস্থানরতদের মানসিক সমস্যায় ভোগার হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
জরিপে উঠে আসে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণকারী মোট ৭৩৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৯১ জন বা ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণের পর ধারণা করা যায়, অনলাইনে ক্লাশ চলমান থাকায় এসব শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসিক সমস্যার হার তুলনামূলক কম বলে গবেষকরা মনে করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে মানসিক ঝুঁকি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের লিডার সাজিয়া ইফফাত বলেন, “এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শিক্ষার্থীদের অগ্রসরের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হই, তবে শিক্ষার্থীরা এ মানসিক সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
উত্তরণের বিষয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, “সমস্যাটা এমন যে, এটা একপাক্ষিকভাবে সমাধান করা কঠিন। আমরা দেখতে পাই, যেসব শিক্ষার্থী ঠিকমত ঘুমাতে যান না, তাদের মাঝে বিষণ্নতা বেশি। যারা অতিমাত্রায় ডিভাইস ব্যবহার করেন তাদের ডিপ্রেশনের হার বেশি। পরিমিত ঘুম, সঠিক মাত্রায় ডিভাইস ব্যবহার, কোনও কিছু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হতে হবে।